in

শিশুর নৈতিক শিক্ষা অর্জনে মা-বাবা ও শিক্ষকের ভূমিকা

শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই তাদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলা আমাদের সবার মৌলিক দ্বায়িত্ব। প্রত্যেক শিশুই তার মা-বাবার কাছে সম্পদ। মা-বাবা সবসময়ই চান তাদের সন্তান মানুষের মতো মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক এবং পরিবার ও দেশের সেবা করুক৷ এই ধরনের মানসিকতা থেকেই ছোট থেকে মা-বাবা সন্তানের শিক্ষার ব্যাপারে অনেক সাবধান থাকেন।

শিশুর নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু মা বাবা ও শিক্ষক; Source: Adoptive Families

অপরদিকে শিক্ষক একটি সুশিক্ষিত জাতি গড়ার কারিগর। শিশুরা মা-বাবা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা পেলেও, প্রাতিষ্ঠানিক সকল শিক্ষা, আদব-কায়দা, আচার-আচরণ, রীতিনীতি সবকিছুই একজন ভালো শিক্ষক থেকে শেখে। তাছাড়া ভবিষ্যতে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও শিক্ষিত জাতি গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজকে আমরা জানবো শিশুকে সুশিক্ষিত করতে মা-বাবা ও শিক্ষকের করণীয় সম্পর্কে:

১. সুন্দর আচরণ করতে শেখান

শিশুরা ছোটবেলায় যা শেখে তা সহজে ভোলে না। এটা তাদের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়৷ তাই প্রাথমিক বিষয়গুলো খুব সাবধানে শেখান। এমন কিছু শেখান যেগুলো তাদের সারাজীবন কাজে লাগবে। যেমন : কোনোকিছু ভাগ করে নেওয়া, বন্ধুদের সাহায্য করা, ক্ষমা করা, মিলেমিশে থাকা, সমস্যা সমাধান করা এবং নম্র-ভদ্র হওয়া ইত্যাদি।

সুন্দর আচরণ করতে শেখান; Source: Learning Liftoff

শ্রেণিকক্ষে বন্ধুদের সাথে কোনো কিছু ভাগ করে নিতে এবং নম্র ও সহযোগী আচরণ করতে উৎসাহিত করার জন্য শিক্ষককে সহায়তা করতে হবে। এছাড়াও বন্ধুদের সাথে খেলার সময় কোনো ঝামেলা না করা বা শ্রেণিকক্ষে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার প্রক্রিয়াও শিক্ষক সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিতে পারে।

যদিও শিশুরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই আচরণগুলো শিখতে পারে না, তবুও তাদের এই বয়সটা শেখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যাতে শ্রেণিকক্ষে এবং বাইরে শিশুর এই আচরণগুলো তার আশেপাশের পরিবেশ ও মানুষকে প্রভাবিত করে।

২. প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করুন

শিশু জন্ম নেয় তার সকল সহজাত প্রতিভা নিয়েই। শিশু জন্মের পর থেকে বাল্যকাল, কৈশোর ও বয়ঃসন্ধিকাল অর্থাৎ যৌবনে পদার্পণ পর্যন্ত পরিবার ও পিতা মাতার আচরণের প্রভাব তার ওপর পড়ে। শিশুর সুকুমার বৃত্তির বিকাশ সাধনের দায়িত্ব তার বাবা-মায়ের।

শিক্ষক তারই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য সচেষ্ট থাকেন। মা-বাবা ও শিক্ষকের আদেশ মান্য করে শিশুরা নিজেদেরকে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী করে গড়ে তুলতে পারে এবং সমাজে ন্যায়নিষ্ঠা ও সততা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

৩. গ্রেডিং এড়িয়ে চলুন

গ্রেডিং হলো দুর্বল ও ভালো স্টুডেন্ট বাছাইয়ের একটি পদ্ধতি। যার মাধ্যমে নির্দিষ্টভাবে ভালো ও দুর্বল স্টুডেন্ট চিহ্নিত করা যায়। বর্তমানে অনেক দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের তাদের সহপাঠিদের মধ্যে গ্রেডিং করা হয়। কিন্তু এই গ্রেডিং প্রথা ভালো ফলাফলের পাশাপাশি অনেক খারাপ ফলাফলও বয়ে আনে।

গ্রেডিংকে গুরুত্ব দেবেন না; Source: PandaTree

প্রতিটি শিশুর মেধার একটি পরিসীমা আছে। কিন্তু সবার মেধার বিকাশ একই বয়সে হবে এমন কোনো কথা নেই। গ্রেডিং এর ফলে যখন নির্দিষ্ট করে জানা যায় কার মেধার ক্ষমতা কেমন, তখন দুর্বল শিক্ষার্থীরা আশাহত হয়ে পড়ে।

আবার গ্রেডিং না থাকলে শিশুরা তাদের দক্ষতা বিকাশ করতে পারে। একটি স্বাচ্ছন্দ্য এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে নতুন করে শেখার চেষ্টা করতে পারে। তাই শিক্ষকদের উচিত গ্রেড বরাদ্দ না করে বরং সেই দক্ষতাগুলো বিকাশে শিশুদের সাহায্য করা।

৪. প্রশংসা করুন তাদের প্রচেষ্টার

শিশুরা প্রশংসা পেতে পছন্দ করে। একটি অবুঝ শিশুকে যখন আপনি হাসিমুখে ‘গুড’ বলবেন, তাতেই সে অনেক খুশি হবে। সাধারণত বাবা-মা ও শিক্ষক উভয়ই সন্তানদের উৎসাহিত করতে এবং কৃতিত্বের ইতিবাচক ধারণা বজায় রাখতে চায়। যার ফলে শিশুদের ভালো কাজগুলোর প্রশংসা করে যায়।

তাদের প্রচেষ্টাকে অভিনন্দন জানান; Source: Study.com

এই প্রশংসাকে আরো কার্যকরী করার একটি উপায় হলো, শিশুর ভাল এবং খারাপ কাজগুলো ভাগ করে নেওয়া। এর মাধ্যমে একজন শিক্ষক বা পিতা-মাতা শিশুর সেই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করে এবং এভাবেই এটাকে শিশুর একটি আকাঙ্ক্ষিত বিষয় হিসেবে পরিণত করে।

প্রশংসার আরেকটি দিক হলো “প্রচেষ্টা”। ছোট শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত ফলপ্রসু হয়। বিশেষ করে যখন শিক্ষক অথবা মা-বাবা শিশুর প্রচেষ্টার প্রশংসা করে দেখায় যে, তারা তাদের শিশুকে সবসময় সমর্থন করে এবং তাদের ছোট্ট প্রচেষ্টাগুলোকে লক্ষ্য করে। শিশুর যেকোনো প্রচেষ্টার প্রশংসা করলে শিশু মানসিকভাবে অনেক অগ্রসর হতে পারবে।

৫. শিশুদের সময় দিন

অনেক বাবা মা চাকুরি করেন বলে সন্তানকে বেশি সময় দিতে পারেন না। তাই তাদের সাথে সব সময় ফোনে যোগাযোগ রাখুন। ঠিকমত স্কুল থেকে বাসায় ফিরল কিনা, ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করল কিনা, ঘুমালো কিনা এবং হোম ওয়ার্কগুলো করে ফেলতে বলুন। এতে আপনার সাথে আপনার সন্তানটির সম্পর্ক সুন্দর থাকবে।

অফিস থেকে ফেরার পর সবটুকু সময় তাদেরকে দিন। তাদেরকে বোঝান তাদের ভবিষ্যৎকে আরও নিশ্চিত ও সুন্দর করার জন্য আপনি চাকুরিটা করছেন। সন্তানকে বেশি করে ভালবাসুন দরকার হলে মৃদু শাসনও করুন।

আজকের ছেলে মেয়েরাই ভবিষ্যতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাই তাদের মানসিক শক্তি অর্জনের দিকে সবাইকে নজর দিতে হবে। মানসিক শক্তি দৃঢ় হলে কোন দুর্বলতাই তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।

৬. পিতামাতা ও শিক্ষকের সম্পর্ক বিকাশ

শিশুর জন্য তার মা-বাবা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তার শিক্ষকও। তাই শিক্ষক ও মা-বাবার মধ্যে ভালো সম্পর্ক থাকা চাই। মা-বাবা এবং শিক্ষক উভয়ই একটি সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেমন একজন শিক্ষক শিশুকে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলতে এবং বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের মতো কাজ শেখাতে পারে। আবার বাবা-মা সহজেই আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুদের সহায়তা করার বিষয় শেখাতে পারে।

পিতামাতা ও শিক্ষকের সম্পর্ক হোক দৃঢ়; Source: 30seconds

শিক্ষক ও অভিভাবকরা একে অপরের সাথে কথা বলে যখন কোনো ডিসিশন নেয় তখন সেটা সবচেয়ে কার্যকরী হয়। তাই শিশুকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে মা-বাবা ও শিক্ষকের নিয়মিত যোগাযোগ রাখা উচিত। অভিবাবকের কাছ থেকে প্রশ্ন বা তথ্য জানার জন্য নিয়মিত যোগাযোগ রাখলে সম্পর্ক আরো মজবুত হয়।

অবশেষে, শিশুরা আগামীর স্বপ্ন। তাই তাদেরকে ছোট থেকে ভাল মানুষ হিসেবে তৈরি করার দায়িত্বটি স্কুল, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের সর্বোপরি আমাদের সকলের। শিক্ষার পাশাপাশি যার মধ্যে নৈতিকতা আছে তার দ্বারা অসামাজিক কার্যক্রম করা কঠিন। তাই সন্তানকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার আগে বলুন একজন ভাল মানুষ হও। তাই বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে সুশিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বটা খুবই প্রয়োজনীয়।

Featured Image Source: 123rf.com

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

শিশুদের বাড়িতে সহজভাবে পড়তে শেখানোর ৭টি কৌশল