in

আপনার সন্তানকে কীভাবে লিঙ্গ সমতা সম্পর্কে শেখাবেন

আমার ছোট ভাই নাহিয়ান। সে লম্বা চুল রাখতে ভালোবাসে। যদি আপনি তাকে তার চুল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন সে নির্দ্বিধায় বলবে ‘আমি লম্বা চুল পছন্দ করি, কারণ আমি সবার চেয়ে আলাদা হতে চাই’। আবার কিছু শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি অন্যরকম। দুটো ছেলে নাহিয়ানকে তার চুল নিয়ে বিরক্ত করছিলো। তারা বলছিলো ‘তোমার চুল এতো লম্বা কেন? লম্বা চুল তো মেয়েদের থাকে’। বাচ্চাদের এমন মানসিকতার কারণ হলো আমাদের সমাজ। কারণ সমাজের মতে ‘শুধুমাত্র মেয়েদের চুল লম্বা থাকে। ছেলেদের তা থাকা উচিত নয়।’

লিঙ্গ বৈষম্যের এই শিক্ষাটুকু শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে পায়। কেননা সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষক তার বাবা-মা। আপনি যদি আপনার সন্তানকে ছোটবেলা থেকে ছেলে-মেয়ের মধ্যে পার্থক্য শেখান, তাহলে তাদের ওপর সেটাই প্রভাব ফেলবে। তাই আপনার সন্তানকে লিঙ্গ সমতা সম্পর্কে জানাতে সর্বপ্রথম আপনাকে সচেতন হতে হবে।

আপনার শিশুকে সঠিক শিক্ষা দিন; Source: Shutterstock

ইউনিসেফ এর মতে, লিঙ্গ সমতা অর্থ “নারী ও পুরুষ, মেয়ে ও ছেলে, একই অধিকার, সম্পদ, সুযোগ এবং সুরক্ষা ভোগ করবে এটা নিশ্চিত করতে মেয়ে ও ছেলে বা নারী ও পুরুষদের চিহ্নিত করতে হবে না, সবার প্রতি একই আচরণ করতে হবে ।” আপনার সন্তানকে লিঙ্গ সমতা সম্পর্কে শেখাতে জেনে নিন কিছু নিয়ম:

১. পোশাক ও খেলনা নির্ধারণ

আমরা সাধারণত মেয়েদের জন্য গোলাপী, লাল ইত্যাদি রঙের পোশাক অথবা খেলনা কিনি। আবার ছেলেদের ক্ষেত্রে নীল, কালো রঙের জিনিসগুলো বেশি নিই। এর মাধ্যমে তারা তাদের মধ্যে যে একটা পার্থক্য আছে তা উপলব্ধি করতে পারে। তারা ভেবেই নেয় মেয়েদের মতো জামা পরা যাবে না অথবা ছেলেদের মতো জামা, খেলনা দিয়ে খেলা যাবে না।

একই রকম খেলনা কিনে দিন; Source: Today’s parent

খেয়াল করুন, তাদের মনে ছেলে-মেয়ের মধ্যে যে একটা পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য কিন্তু বাবা-মাই দায়ী। তাই আপনার সন্তানকে এমন পোশাক বা খেলনা কিনে দিন যেটা দিয়ে ছেলে-মেয়ে উভয়ই খেলতে পারবে এবং উভয়ই পরতে পারবে। কিন্তু যদি আপনার সন্তান স্বাভাবিকভাবেই কোনো খেলনা বা পোশাকের প্রতি আগ্রহী হয় তাহলে তাদের পছন্দের জিনিসটি দেওয়ার চেষ্টা করুন।

২. শিশুর আচরণের অজুহাতে ‘লিঙ্গ’

শিশুর আচরণের ভিন্নতার অজুহাত হিসেবে লিঙ্গ ব্যবহার করবেন না। ‘ছেলেরা ছেলেদের মতো হবে’ আর ‘মেয়েরা মেয়েদের মতো হবে’ এমন কোনো কথা নেই। এটা সম্পূর্ণ আমাদের সামাজিক চিন্তাধারা। তাই আপনার সন্তানের আচরণের সাথে লিঙ্গ তুলনা করে তাদের মানসিকতা পরিবর্তন করবেন না। কারণ এতে তারা ভাববে যে, নির্দিষ্ট কাজটি শুধু ছেলেদের করতে হয় অথবা মেয়েরা তা করতে পারে না।

শিশুর আচরণের প্রভাব; source: parents magazine

প্রায়ই পরিবারে দেখা যায় শিশুদের কথা, কাজ, চলাফেরা সবকিছুকে আলাদাভাবে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ করে দেওয়া হয়। যেমন খুব চঞ্চল একটা মেয়েকে সবসময় শুনতে হয়, মেয়েরা এতো চঞ্চল হতে নেই। তেমনি একটা চুপচাপ ছেলেকে বলা হয়, মেয়েদের মতো চুপ করে থাকো কেন? এই ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসুন এবং আপনার সন্তানকেও উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে বড় করুন।

৩. আপনি কীভাবে আপনার সন্তানের আচরণ বর্ণনা করেন?

আমাদের সমাজে সাধারণত মেয়েদের ক্ষেত্রে সুন্দর, মিষ্টি, রাজকুমারী ইত্যাদি এবং ছেলেদেরকে সুদর্শন, শক্তিশালী, রাজকুমার ইত্যাদি প্রথাগত বিশেষণগুলো ব্যবহার করা হয়। আপনি আপনার সন্তানকে এসব বিশেষণের মাধ্যমে সম্বোধন করে তাদের মধ্যে ভিন্নতা ফুটিয়ে তুলছেন না তো? আপনার সামান্য বিশেষণগুলোই তাদের মনে লিঙ্গ বৈষম্যের ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। তাই কিছু বলার সময় সঠিক ভাষা ব্যবহার করুন।

তাদের আলাদাভাবে প্রশংসা না করে বরং ছেলে-মেয়েদের মূল্যবান বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রশংসা করুন। তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন আপনার কাছে ছেলে-মেয়ে দুজনই সমান। উধাহরণস্বরূপ এটি নিশ্চিত করতে আপনার মেয়ের শক্তি ও তার উদারতার প্রশংসা করতে পারেন।

৪. সম্মান ও সহমর্মিতা শেখান

আপনার শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আপনি তাদের যেমন শিক্ষা দিয়ে বড় করবেন, তারা সেটাই শিখবে। তাই আপনার সন্তানকে বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করতে শেখান। আপনার সন্তান যখন ছেলে-মেয়ে উভয়কে একইভাবে সম্মান করা শিখবে তখন তার আচরণে নারী-পুরুষের কোনো পার্থক্য থাকবে না।

আপনার শিশুকে সহমর্মিতা শেখান; Source: Verywell Family

সহমর্মিত হলো অন্যের কষ্টে ব্যথিত হওয়া৷ ধরুন আপনার সন্তান অন্য শিশুদের সাথে খেলছে। খেলায় তো হার জিত থাকবেই। শেষ পর্যন্ত আপনার সন্তান জয়ী হলো। সেক্ষেত্রে আপনি তাকে শেখাবেন কীভাবে সহানুভূতি প্রদর্শন করতে হয়। এটাই সহমর্মিতা। এই সহমর্মিতা শেখার ফলে সে কখনো অন্যকে কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করবে না।

৫. সুস্থ যৌনতা নিয়ে আলোচনা করুন

একটা সময় আপনার সন্তান যৌনতা সম্পর্কে জানার উপযুক্ত হয়। এই সময় সন্তানদের কাছ থেকে বাবা-মায়েদের কিছু কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তারা যখন বাবা-মায়ের কাছে এই বিষয়ে কিছু জানতে চায় তখন অনেক বাবা-মা এমন প্রশ্নে বিভ্রান্ত হয়ে এড়িয়ে যায় অথবা অস্পষ্ট কিছু উত্তর দিয়ে চালিয়ে দেয়।

অনেক বাবা-মা এটাও ভাবেন যে সন্তানের সাথে যৌনতা বা দেহ সম্পর্কিত কথা বলা লজ্জাকর। কিন্তু এটা করা উচিত না। কারণ আপনার সন্তানকে আপনি না জানালে সে কৌতুহলবশত এসব জানতে অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করবে। যেটা আপনার ভালো লাগবে না। তাই আপনার সন্তানের যাতে এই বিষয়ে আলাদা কোনো কৌতুহল না সৃষ্টি হয়, সেজন্য আপনাকে বিষয়গুলো খুব স্বাভাবিক এবং জাগতিক নিয়ম বলে বোঝাতে হবে।

আপনার সন্তানকে সঠিক যৌন শিক্ষা দিন; Source: Crosswalk.com

অতএব জেন্ডার বা লিঙ্গ সমতা বলতে সমাজে নারী-পুরুষের একই সাথে সঠিক ভূমিকা ও সমস্যা মূল্যায়ন নিশ্চিত করণকে বোঝায়। নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। দক্ষিণ এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার শীর্ষে। তাই আশা করা যায় আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের শিশুরাও লিঙ্গ সমতা সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতে পারবে।

Featured image source: Baby Sleep

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

শিশুকে কোনো কিছু চাওয়ার কৌশল শেখাবেন যেভাবে

শিশুদের নিয়মিত হোমওয়ার্কের অভ্যাস করাবেন যেভাবে