in

যে কারণে সন্তানের সিদ্ধান্তে হ্যাঁ বলা উচিত

সন্তানের যেকোনো বিষয়ে না বলা যেন অভিভাবকদের একটা ঐতিহ্যগত ব্যাপার। বেশিরভাগ অভিভাবক মনে করে সন্তানের যেকোনো আবদার বা অভিযোগে না সূচক জবাব দিতে হবে। যেহেতু তারা ছোট এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিপক্ব না, তাই তাদের সব সিদ্ধান্ত ভুল এবং কোনোভাবেই তাদের প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

কিন্তু আমরা একবারও ভেবে দেখি না বাড়ন্ত শিশুর জন্য, বিশেষ করে দুই বছর এবং ১৪ বছর বয়সে তাদের বিভিন্ন আবদার এবং কর্মকাণ্ডের বিপরীতে আপনার ক্রমাগত না সূচক জবাব ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো শোনায়। ক্রমাগত সন্তানকে না বলা অত্যন্ত হতাশাজনক।

Source: Parenting Ideas

অবশ্য সন্তান জন্মের আগে থেকে ক্রমাগত না বলার জন্য কেউ প্রতিজ্ঞা করে না। আবার সন্তানের সাথে পিতামাতা বা অভিভাবকের কোনো শত্রুতাও থাকে না। তাই না বলা খারাপ না, যদি আপনি তাকে কখনো কখনো হ্যাঁ বলেন, তাহলে অবশ্যই না বলতে পারেন। কেননা সন্তানের নিরাপত্তা এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তাদের প্রতি না সূচক মনোভাবের জন্ম হয়।

তাই সন্তানের যেকোনো আবদার নাকচ না করে যুক্তিসঙ্গত কারণে না বলুন। তাকে বুঝিয়ে দিন আজ তার আবেদনে না বলেছেন তার অর্থ আগামীকাল বা পরশুও না বলবেন এমন নয়।

তাছাড়া না সূচক জবাবের বিপরীতে সন্তানকে হ্যাঁ বলার অপরিসীম শক্তি আছে। সন্তানের কোনো কোনো ইতিবাচক এবং যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তে হ্যাঁ বলুন। হ্যাঁ শিশুর মধ্যে বিস্ময়কর গুণাবলীর বিকাশ ঘটায়, যা তার আত্মবিশ্বাস এবং সাহস তৈরিতে সহযোগিতা করে। বিষয়গুলো আরও বিস্তারিতভাবে নিচে আলোচনা করা হলো।

দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটাতে

ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুর জন্য এই দায়িত্ববোধের চর্চা করা অত্যাবশ্যক। তাই শিশুকে ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের চর্চা করার সুযোগ দিতে হবে। শিশুকে ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ শিক্ষা দেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো বিশেষ কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে তার সিদ্ধান্তে হ্যাঁ সূচক জবাব দেওয়া।

Source: Phys

তবে এর সাথে সাথে শিশুকে যথাযথ সময় জ্ঞান দিতে হবে। কখন কেমন দায়িত্ববোধের চর্চা করবে তা আপনাকে নির্ধারণ করতে হবে। সঠিক সময়জ্ঞান শিশুকে শিক্ষা দেই, জীবনের ভালো এবং কল্যাণকর বিষয়গুলো সময়ের সাথে সাথে শর্ত বা দায়িত্ব হিসেবে আসে।

যেমন আপনার শিশুকে বলুন, তুমি তখনই সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে থাকতে পারবে যখন তুমি বন্ধুদের সাথে দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করতে পারবে এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকার ব্যাপারে শিশুকে স্বাধীনতা দেওয়ার সাথে সাথে যে শর্ত জুড়ে দেওয়া হলো, তা তাকে দায়িত্বপূর্ণ এবং সচেতন করে তুলবে।

ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে

শিশুদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কেননা আজকের শিশু খুব দ্রুতই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষে পরিণত হবে। তাই শৈশব থেকেই যদি সে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুণাবলী এবং আত্মবিশ্বাস রপ্ত না করে তাহলে ভবিষ্যৎ জীবনে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাবে। তাই তাদের অনুরোধে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে ব্যক্তিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত হবে। যার ফলে তার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে।

Source: My Heritage Blog

যেমন : শিশুকে বলুন, তুমি অবশ্যই বাহিরে খেলতে যেতে পারো যদি তুমি ঠিক সময়ে বাড়িতে ফিরে আসো, অথবা তুমি এই খেলনাটি কিনতে পারো যদি তার মূল্য পরিশোধ করার জন্য তুমি প্রস্তুত থাকো।

তবে শিশুরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে। অপেক্ষাকৃত উত্তম বিষয় বাদ রেখে গৌণ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। এক্ষেত্রে আপনাকে দায়িত্ব নিয়ে তার মধ্যে অধিক গ্রহণযোগ্য এবং ভালো বিষয় নির্বাচন করার গুণাবলী সৃষ্টি করতে হবে। যেকোনো বিষয়ের ভালো এবং খারাপ দিক তার সামনে স্পষ্ট করে তুলতে হবে এবং তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে হবে। এরপর যখন সে নিজে থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করবে তখন তার সকল সিদ্ধান্তে হ্যাঁ বলতে হবে এবং তাকে উৎসাহ দিতে হবে।

সহযোগিতার মানসিকতা বিকাশে

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার এই সময়ে মানুষগুলো আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। শুধু নিজের কল্যাণ, সাফল্য এবং সমৃদ্ধির জন্য মানুষ কাজ করে। অন্যের অধিকার নিশ্চিত করা বা সুযোগ সৃষ্টি করার ব্যাপারে মানুষ উদাসীন। এই বাস্তবতায় সন্তানের মধ্যে সহযোগিতার মানসিকতা বিকাশের জন্য তাকে হ্যাঁ বলুন। তার এমনসব সিদ্ধান্তে হ্যাঁ বলুন যেখানে অন্যকে সহযোগীতা করার সুযোগ থাকে। তার জন্য হ্যাঁ বলার সাথে সাথে একটি এবং যুক্ত করে দিন।

Source: Metro Parent

যেমন : আপনার সন্তানকে বলুন, তুমি তোমার বন্ধুর বাড়ি যাও এবং তোমার ছোট ভাইকে খেলার মাঠে পৌঁছে দাও, অথবা তুমি নিজে ফল কেটে খাও এবং তোমার মাকে কেটে দাও।

এভাবে শৈশবে সন্তানের মধ্যে অন্যকে সহযোগীতা করার মানসিকতা তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যৎ জীবনে বিভিন্ন মানুষের সাথে যোগাযোগ এবং সম্পর্ক স্থাপনে অন্যদের তুলনায় সে অনেক এগিয়ে থাকবে।

পিতামাতা হিসেবে সন্তানের ওপর প্রভাব বিস্তার করার যথেষ্ট সুযোগ আপনার আছে। এমনকি তার জীবন পরিবর্তন করার অপরিসীম শক্তিও আপনার আছে। আপনার এই শক্তি এবং ক্ষমতা বলে তাকে না বলা এবং দমিয়ে রাখা খুব সহজ। কিন্তু হ্যাঁ বলার সাথে সাথে সন্তানের মানসিক বিকাশের যে অবারিত সুযোগ উন্মুক্ত হয় তার সুফল অন্বেষণ করাও আপনাকে শিখতে হবে।

Source: Parent 4 Success

সুতরাং সন্তানকে হ্যাঁ বলতে ভয় পাবেন না। বরং হ্যাঁ বলার সাথে সাথে উপরে আলোচিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করুন। তাহলে আপনার সন্তান ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। যার মধ্যে দায়িত্ববোধ থাকবে, থাকবে অন্যকে শ্রদ্ধা এবং সহযোগিতা করার মানসিকতা। একই সাথে সে হয়ে উঠবে সুবিবেচক এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী।

Feature Image: Parent 4 Success

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

অশান্ত ও অদ্ভুত ১৩ বছর বয়স

শিশুকে কোনো কিছু চাওয়ার কৌশল শেখাবেন যেভাবে