in

অশান্ত ও অদ্ভুত ১৩ বছর বয়স

১৩ একই সাথে প্রাণবন্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ একটি বয়স। এই বয়স মানুষের দ্বিতীয় জীবন শুরুর বয়স। শৈশব থেকে কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনপ্রাপ্ত হওয়ার বয়স। তাই এই বয়সী সন্তানের পিতামাতা এবং অভিভাবকের কাছ থেকে বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। দোদুল্যমান এই বয়সে আত্মবিশ্বাস এবং আত্মশক্তি ধরে রাখতে সন্তানেরাও বিশেষ সমর্থন এবং যত্ন আশা করে।

Source: Vancouver Family Magazine

এই বয়সী সন্তানের লালন-পালনে পিতা-মাতাকে সহযোগিতা করতে আজকের নিবন্ধে কিছু বিশেষ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হল।

দোদুল্যমান সময়

১৩ বছর বয়সে ছেলেমেয়েরা জীবনের একটা দোদুল্যমান সময় পার করে। এসময় তারা নিজেদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকে না। একই সাথে তারা আপনার ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল থাকে। আবার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং পছন্দের ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে। তাই সন্তানের এই সময়ের মেজাজ ধরতে পারা অভিভাবকের জন্য খুব কঠিন।

Source: Raising Children Network

দিনের শুরুতে হয়তো আপনার সন্তান বলবে, স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য আমাকে নতুন করে বলতে হবে না। এই কথার মধ্য দিয়ে তার ব্যক্তি সচেতনতা প্রকাশ পায়। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে এমন অবস্থা ধারণ করবে যেন সে যা করতে চলেছে সে ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নেই।

১৩ বছর বয়সী সন্তানের এমন হঠাৎ হঠাৎ সিদ্ধান্ত এবং ভাবনা পরিবর্তন স্বাভাবিক। তাদের মানসিক অবস্থা আপনাকে বুঝতে হবে। কোনো প্রকার যুক্তি তর্কে জড়ানো যাবে না। বরং এমন মনোভাব প্রকাশ করতে হবে যেন তার যেকোনো সিদ্ধান্ত এবং ভাবনার ব্যাপারে আপনি যত্নশীল। সব সময় তার পাশে থেকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।

দ্বিমুখী চেহারা

১৩ বছর বয়সী ছেলে মেয়েরা দ্বিমুখী চেহারার হয়ে থাকে, অর্থাৎ তারা সম্পূর্ণভাবে শিশু হওয়া সত্বেও কখনো কখনো বাড়ন্ত কিশোরের মতো আচরণ করে। ছোট্ট ছেলে মেয়েদের খেলনা নিয়ে শিশুদের সাথে প্রাণবন্ত খেলায় মেতে ওঠে। আবার পরমুহূর্তেই বাড়ন্ত কিশোরদের সাথে মিশে বড়দের বিষয় নিয়ে আলোচনায় মেতে ওঠে। এমনকি অবস্থাভেদে কিশোরদের সাথে ধূমপানের আড্ডায় মেতে ওঠে। সব মিলিয়ে এটি খুব জটিল একটি বয়স।

Source: Very Well Family

আপনার সন্তানকে বাড়িতে বা ঘরোয়া পরিবেশে শিশুদের সাথে মেশার সুযোগ দিন। আবার বাইরের মানুষের মধ্যে তাকে কিশোরদের মতো আচরণ করার অধিকার দিন। তবে তার আচরণগত নিরাপত্তার ব্যাপারে অধিক সচেতন থাকুন। শিশুরা এসময় কৈশোরে পদার্পণ করে এবং ক্রমশ যৌবনের দিকে ধাবিত হয়। তাই এই সময়ের বাস্তবতা আপনাকে মেনে নিতেই হবে।

আবার এই বয়সেই ছেলেমেয়েরা অসৎ সঙ্গে মিশে ভুল পথে পা বাড়ায়। সুতরাং তাদের বাইরের পরিবেশে মেশার সুযোগ দেওয়ার সাথে সাথে মানসিক এবং শারীরিক নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকুন। এসময় ছেলেমেয়েরা যেমন কিশোরদের সাথে মিশবে ভবিষ্যতে সে তেমন কিশোর হয়ে উঠবে।

নতুন সম্ভাবনা এবং দ্বিধা

এই বয়সের ছেলেমেয়েরা যুবক মানুষের মতো নতুন নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখে এবং ছোট ছোট চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু ইতিবাচক থাকার বদলে তারা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে গিয়ে নেতিবাচক দিকটা বেশি মূল্যায়ন করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিপদ, অনিশ্চয়তা নিয়ে বেশি বেশি চিন্তা করে বিমর্ষ হয়ে পড়ে।

বিচক্ষণ পিতামাতারা এসময় সন্তানের পাশে দাঁড়ায়। পিতামাতার আশ্বাস তাদের প্রাণবন্ত করে তোলে। যার ফলে তারা যেকোনো আশংকা বা ভয় নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয় এবং যেকোনো পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।

ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পরিবর্তন হয় বেশি

১৩ বছর বয়সে মানুষের মস্তিষ্ক পুরোপুরি পুনর্গঠিত হয়, অর্থাৎ আক্ষরিকভাবে মস্তিষ্ক নতুনভাবে সজ্জিত হয়। তাই এই বয়সে অনেক শিশু অসঙ্গতিপূর্ণ, উদ্ধত এবং মুডি আচরণ করে।

Source: Health Tap

তবে এই পরিবর্তন ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বেশি হয়। আপনি হঠাৎ করেই আবিষ্কার করবেন আপনার ১৩ বছর বয়সী মেয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিপাটি, গোছালো হয়ে উঠেছে এবং পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বেশি আগ্রহ নিয়ে আপনার কাছাকাছি থাকতে চাইছে। এ সময় তার সাথে কোনো যুক্তি তর্ক বা দূরে ঠেলে দেওয়ার মতো কাজ করা যাবে না। বরং আন্তরিকতার সাথে তার আন্তরিক এবং প্রিয় উপস্থিতি উপভোগ করুন। বন্ধুর মতো তার সঙ্গী হয়ে উঠুন।

ছেলেরা মাকে চ্যালেঞ্জ করে

এই বৈশিষ্ট্যটি অদ্ভুতভাবে শুধু ছেলেদের মধ্যে দেখা দেয়। এই বয়সে ছেলেরা বিভিন্ন বিষয়ে তার মাকে চ্যালেঞ্জ করে। অনেক ক্ষেত্রেই মা বোকা বনে যায়, অথবা বিরক্ত হয়। যদি হঠাৎ করে নিজের ছেলে সন্তানের মধ্যে এমন আচরণ লক্ষ্য করেন তবে বিরক্ত না হয়ে তার প্রতি সদয় হোন এবং সহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ করুন।

খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি

আগেই বলেছি ১৩ বছর বয়স অত্যান্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং এই বয়সী ছেলে মেয়েরা হঠাৎ করে যেকোনো খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। তাই খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকুন।

Source: Mom Junction

সব সময় কোমলতা নয়, কখনো কখনো শাসন করার জন্য মানসিকভাবে দৃঢ় থাকুন। মনে রাখবেন, শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ জীবন নিশ্চিত করতে সব সময় নায়ক নয় কখনো কখনো খলনায়কও হতে হয়।

সমালোচনায় সংবেদনশীল

এই বয়সী ছেলেমেয়েরা সমালোচনার ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে থাকে। সুতরাং আপনার পরামর্শ ও প্রতিক্রিয়া যেন তার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। অনেক সময় সুপরামর্শ এবং নির্দেশনা শিশুর কাছে ব্যক্তিগত আক্রমণ বলে মনে হয়। সুতরাং তাকে বলা প্রতিটি কথা আপনার কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য সেটা মুখ্য বিষয় নয়, বরং তার দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য সেটাই মুখ্য বিষয়, এ ব্যাপারে সচেতন থাকুন।

সন্তানের পরিপক্বতা উৎসাহিত করুন

সন্তানের পরিপক্ব আচরণে সমালোচনা নয় বরং তাকে উৎসাহিত করুন। তাকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দেওয়ার সাথে সাথে তার পরিপক্ব এবং যুক্তিপূর্ণ আচরণে প্রশংসা করুন। তার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য সবসময় তার পাশে থাকুন।

Source: She Knows

এছাড়া এই বয়সী ছেলে মেয়ে সব বিষয়েই অপরিপক্ব এবং অদক্ষ হয়ে থাকে। তাই সবসময় তাদের বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়। এই কারণে তাদের সাথে দৈনিক পর্যাপ্ত সময় কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি করুন। তাহলে আপনার ১৩ বছরের সন্তান ভবিষ্যতের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে সঠিক পরিপক্কতায় নিয়ে বেড়ে উঠবে।

Feature Image: Mom Junction

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

নেতৃত্বের গুণাবলি সম্পন্ন শিশুকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন

যে কারণে সন্তানের সিদ্ধান্তে হ্যাঁ বলা উচিত