in

শিশুর অ্যাংজাইটি ডিজওর্ডার কী? (পর্ব- ২)

শিশুর অস্বাভাবিক আচরণে অনেক সময় অভিভাবকেরা শিশুকে কড়া শাসন করে থাকেন। অনেক অভিভাবকের ধারণা শিশুর অত্যধিক চঞ্চলতা থেকে সে এসব আচরণ করে থাকে। কিন্তু শিশুর ইতিবাচক বা নেতিবাচক আচরণ যেটিই সে প্রকাশ করে থাকুক না কেনো সেটি শিশুর অভ্যন্তরীণ অবস্থার প্রতিচ্ছবি। তাই শিশুর নেতিবাচক আচরণের পিছনে কী কারণ নিহিত আছে সেটি আগে চিহ্নিত করতে চেষ্টা করুন।

image source: readers digest

উদ্বিগ্ন শিশুর আচরণে অনেক সময় অনেক অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। এই অস্বাভাবিকতা শারীরিক বা মানসিক উভয়ভাবেই প্রকাশ পেতে পারে। যেমন হাত পা কাঁপা, প্রচণ্ড ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বুকে, পেটে বা গায়ে ব্যাথা, বিছানা ভেজানো ইত্যাদিকে শারীরিক লক্ষণ বলা হয়।

আবার মানসিকভাবে প্রকাশিত লক্ষণগুলোর মাঝে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার প্রবণতা, একই কাজ বারবার করার প্রবণতা, ব্যক্তির সাথে ঘটে যাওয়া নৃশংস কোনো ঘটনার নেতিবাচক মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে না পারা ইত্যাদি। সাধারণ শিশুদের বেলায় কয়েকদিনের মাঝেই তারা এমন পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসে। কিন্তু যাদের মাঝে উদ্বিগ্নতা বা অ্যাংজাইটি সমস্যা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।

অবসেসিভ কমপালসিভ
ডিসঅর্ডার

মনে অযৌক্তিক চিন্তা
ভাবনার উদয় হওয়া বা এক কাজের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডারের
লক্ষণ প্রকাশ পায়। কোনো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা এবং তা থেকে পরিত্রাণের
জন্য অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঐ বিষয় সংক্রান্ত কাজ কর্মের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে।

ওডিসি তে আক্রান্ত শিশুটি অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে কমাতে চাইছে তার উদ্বিগ্নতা; image source: youtube

সাধারণ মানুষের মাঝে অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার বা ওডিসি বা শুচিবায়ু হিসেবে অধিক পরিচিত। ভিত্তিহীন চিন্তা-ভাবনা মনে ভিড় জমাতে থাকে। এই দুশ্চিন্তাকে প্রতিহত করতে বা কমিয়ে আনতে ব্যক্তি এমন কিছু কাজের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। তার মতে, সে কাজের মাধম্যে তার দুশ্চিন্তা লাঘব হবে। এর ফলে মানসিকভাবে সে কিছুটা শান্তি অনুভব করে।

লক্ষণ

পরিষ্কার করার তাগিদ; হাত বা শরীর যথেষ্ট পরিষ্কার থাকার পরেও ময়লা লেগে আছে ভেবে বার বার ধুতে থাকে, ঘরের আসবাবপত্রের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও একই চিন্তাকে অনুসরণ করে। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও পরিষ্কার করার কাজ চলতে থাকে বারেবারে।

ওডিসি আক্রান্ত ব্যক্তির লক্ষণসমূহ; image source: wikihow

যাচাই করার তাগিদ; স্কুলের ব্যাগে বই খাতা সব রাখা হয়েছে কিনা শিশু বারবার তা যাচাই করে দেখে, এমনভাবে গ্যাসের চুলা বন্ধ করা হয়েছে কিনা, দরজায় তালা লাগানো হয়েছে কিনা এসব বিষয় বারবার নিশ্চিত হয়েও সন্দেহের দোলাচল চলতে থাকে মনে।

সব জিনিস সুনির্দিষ্ট ধরনে সাজিয়ে রাখার তাগিদ; অনেকের মাঝে দৈনন্দিন কাজগুলো একটি নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী করতে দেখা যায়। সেই ধারা বিঘ্নিত হলে আরো বেশি অস্থির হয়ে পরে।

প্রতিকার

মনোচিকিৎসকের সাহায্যে স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব; image source: musculardysrophynews.com

রোগের মাত্রা বুঝে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে। রোগ বেশি মাত্রায় থাকলে তথা রোগী দৈনন্দিন কাজ-কর্মে অসুবিধার সম্মুখীন হলে তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস
ডিজঅর্ডার

প্রতিদিনের মতো আজও স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে সুমন। তাদের বাড়ির পাশের গলি পেরিয়ে সবে বড় রাস্তায় উঠেছে সে। চোখের পলকেই এক একটা ট্রাক একজন পথচারীকে পিষে দিয়ে গেলো। মুহূর্তেই একদলা মাংসপিণ্ডতে পরিণত সেই পথচারীকে দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইলো সুমন। সেদিনের কোনো কাজে সুমন মন দিতে পারছিলো না। এভাবে কেটে গেলো বেশ কিছুদিন।

পিটিএসডিতে আক্রান্ত শিশু অস্থিরতায় ভুগছে; image source: wikihow

সুমনের মতো ভয়াবহ কোনো
দুর্ঘটনার সাক্ষী হওয়া, দৈহিক জখম, ধর্ষণ, মানসিক নির্যাতন ইত্যাদি ঘটনা থেকে
শিশুমনে এই রোগের বীজ বপন হতে দেখা যায়।

লক্ষণ

image source: readers digest

মাসখানেকের মাথায় সুমন
আবিষ্কার করলো ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না সে। মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে যায়
তার। মনে পড়ে যায় সেই ভয়াল দৃশ্য। স্কুলে যেতে ভালো লাগে না, সব কাজে বিরক্ত
প্রকাশ করে, একাকী থাকতে ভালো লাগে। শারীরিক কিছু সমস্যাও দেখা দিয়েছে। গায়ে বা
বুকে ব্যাথা, হাত পা কাঁপা, পেটে ব্যাথা, বিছানা ভিজানো ইত্যাদি।

প্রতিকার

পিটিএসডি রোগের ক্ষেত্রেও জটিলতা বুঝে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে। সাধারণত স্বাভাবিক অবস্থায় কিছুদিনের মধ্যেই জটিলতা কাটিয়ে সম্ভব হয়। কিন্তু ৪ সপ্তাহ পরেও ব্যক্তির মাঝে উপরোক্ত আচরণ করতে দেখা গেলে তখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শের প্রয়োজন হয়। সাইকোথেরাপি ও মেডিকেশনের মাধ্যমে এই রোগের উপশম করা হয়।

ভীতিরোগ বা ফোবিয়া

ছোট্ট রুনার পা যেনো লেগে গেছে মেঝের সাথে। জায়গা থেকে টলতে পারছে না সে। চোখের পলকও পড়ছে না। লক্ষণগুলো দেখে বুঝে নিয়েছেন রুনা কোনো কিছু দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। হ্যাঁ, বাথরুমের দেয়ালে এক মাকড়সা দেখে এমন অবস্থা তার। এই ধরনের আতঙ্কিত অবস্থাকে ভীতিরোগ বা ফোবিয়া বলে অভিহিত করা হয়।

স্পেসিফিক এনিমেল ফোবিয়াতে ভীত শিশু; image source: coping cat parent

শিশু বা অনেক ক্ষেত্রে
প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তিও ফোবিয়ার স্বীকার হয়ে থাকেন। খুবই সাধারণ কোনো বিষয়ে যা
নিয়ে ভয় বা উদ্বিগ্ন হবার কথা নয় তেমন বিষয়েও মাত্রাতিরিক্ত ভয় পেয়ে থাকেন ফোবিয়া
আক্রান্তরা। জীবজন্তু, রক্ত, অন্ধকার, উচ্চতায় আরোহণ, কীটপতঙ্গ বিশেষ করে মাকড়সা
বা তেলাপোকা, উচ্চতা, বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকানো ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের ভীত হবার
মাত্রা থাকে অস্বাভাবিক পর্যায়ের।

জৈবিক কারণ, বংশগত কারণ ও
পরিবেশের কিছু উপাদান ( বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, শারিরীক অসুস্থতা, পরিবারে কারো
মৃত্যু) এই ফোবিয়া অ্যাংজাইটি তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রাখে।

প্রতিকার

শিশুদের ক্ষেত্রে সাইকোথেরাপি প্রয়োগ করে বা এন্টি-অ্যাংজাইটি মেডিকেশনের মাধ্যমে ফোবিয়ার প্রতিকার করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে অভিভাবকের কিছু করণীয় রয়েছে। নির্দিষ্ট যে বিষয়টিতে সন্তানের ভয় সেটিকে দূর করতে সাহায্যপূর্ণ আচরণ করতে হবে। “এতে ভয় পাওয়ার কী আছে”, বা এসব নিয়ে শিশুকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা যাবে না। বরং ঐ জিনিস নিয়ে অভিভাবকের আচরণ হবে সাধারণ যাতে শিশু ও ধীরে ধীরে এটিকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করতে পারে।

Featured image : wikihow

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে শিশুর রাগান্বিত মনোভাব প্রতিরোধ করবেন যেভাবে

সন্তানের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম ও মাত্রা যেভাবে নির্ধারণ করবেন