in

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে শিশুর রাগান্বিত মনোভাব প্রতিরোধ করবেন যেভাবে

শৈশবের রাগান্বিত মনোভাব শিশুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা এমন এক খারাপ আচরণ যা বিশেষ বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রকাশিত হয় এবং খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, অসংখ্য শিশুর মধ্যে এই প্রবণতা আছে। যার কারনে তারা স্কুলে বন্ধু হারায়, এমনকি খেলার মাঠেও টিকে থাকতে পারে না।

Source: What The Flicka?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও অঙ্গরাজ্যের এক পিতা তার মেয়ের অবস্থার জন্য মেয়ের রাগান্বিত মনোভাবকে দায়ী করেছিল। রাগান্বিত মনোভাব এবং বন্ধুদের অসহযোগিতা করার অপরাধে স্কুল বাসে তাকে নিষিদ্ধ করার পর দীর্ঘ ৮ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে তাকে স্কুলে যেতে হয়েছিল। ১০ বছর বয়সী এই শিশুর পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়ার দৃশ্য ভিডিও করে তার বাবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে এবং দ্রুতই তা ভাইরাল হয়ে যায়। বিশ্বব্যাপী ১৫ মিলিয়ন মানুষ এই ভিডিও দেখে। এই ভিডিওতে সাধারণ মানুষের মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। অনেকে পিতার পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কেউ কেউ পিতার সাথে সুর মিলিয়ে সন্তানের রাগান্বিত মনোভাবকে দায়ী করে।

আসলে সন্তানকে তার রাগান্বিত মনোভাবের জন্য শাস্তি দিতে হলে কী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেছে নিতে হবে? মনে রাখা দরকার বিষয়টি সন্তান এবং পিতা-মাতার ব্যক্তিগত। এভাবে শাস্তি দিয়ে শৃঙ্খলা শেখানোর প্রয়োজন নেই। সন্তানের রাগী মনোভাব মোকাবেলা করতে হলে আপনাকে কিছু বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চলুন তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি।

ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা বজায় রাখুন

শিশুরা অনেক বেশি স্পর্শকাতর হয়ে থাকে। এমনকি বাবা-মা, ভাই-বোন বা নিকটাত্মীয়রা তার শৃংখলার ব্যাপারে সচেতন হলে সে অস্বস্তিবোধ করে। অতি স্পর্শকাতর কোনো কোনো ছেলেমেয়ে শৃঙ্খলা নিয়ে পিতামাতার নির্দেশনা অপমানবোধ করে।

Source: Yahoo

এই বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা বিরাট অংশ দখল করে আছে। তাই ভালো মন্দ চিন্তা না করেই আমরা অনেক কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করি। যা অনেক সময় খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। মেয়ের কৃত অপরাধের শাস্তি হিসেবে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে বাস থেকে নিষিদ্ধ করেছে। যার ফলে তাকে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হচ্ছে।

এই ঘটনা মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য বা ভুলের উদাহরণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করলেও ফলাফল কিন্তু বিপরীত হতে পারে। কেননা ইন্টারনেটে একবার কোনো কিছু প্রকাশ করলে তা যদি ভাইরাল হয়ে যায় তবে বিভিন্ন সময় ঘুরে ফিরে সেই দৃশ্য আপনার সামনে চলে আসে। আজকের শিশু বড় হলে সামনের দিনে এই দৃশ্য তাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে পারে এই নেতিবাচক দিকগুলো মেয়েটার বাবা ভিডিও পোস্ট করার সময় ভাবেনি। শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহজলভ্যতার কারণে কোনো চিন্তাভাবনা না করেই ওই বাবা কাজটি করেছিল।

Source: Friendship Circle

ভেবে দেখুন তাকে যদি আরও ৩০ বছর পূর্বে এই কাজটি করতে হতো, তাহলে নিশ্চয়ই তার পক্ষে শুটিং সামগ্রী ভাড়া করে ভিডিও চিত্র ধারণ করে সব থিয়েটারে তা প্রচার করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু ঘটনাটি ৩০ বছর আগে ঘটলেও মেয়ের শাস্তি এবং অনুভূতি একই রকম থাকতো।

সুতরাং কিছু বিষয় গোপন থাকাই ভালো। গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার ব্যাপারে আপনাকে অধিক সচেতন হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সন্তানকে শিক্ষা দেওয়ার প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে। কেননা ভবিষ্যতে তা আরো খারাপ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।

নিজের দায়বদ্ধতা স্বীকার করুন

তবে এটা প্রশংসনীয় যে ওই পিতা রাগান্বিত আচরণের জন্য সন্তানকে দায়ী করেছিল। যেখানে সিংহভাগ পিতামাতা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না। ওই পিতা বাস ড্রাইভারের সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছিল। কিন্তু অধিকাংশ পিতামাতা সন্তানের অসৌজন্যমূলক আচরণ নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ আমলে নেয় না। তারা ভাবে বাচ্চারা এমন ঘটনা ঘটাতে পারে, এটাই সাধারন।

Source: COPMI

সুতরাং এক্ষেত্রে ওই পিতাকে সাধুবাদ, কিন্তু সে যে পন্থায় মেয়ের শাস্তির বিধান করেছিল তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই ধরনের শাস্তি দীর্ঘমেয়াদে কোনো ভালো ফল আনে না। তাই সন্তানের এমন আচরণের জন্য সন্তানের দায়বদ্ধতার পাশাপাশি নিজেও দায়বদ্ধ হোন। সন্তানকে সঠিক পারিবারিক শিক্ষা দেওয়ার অভাব উপলব্ধি করুন।

সম্পর্ক পুনঃস্থাপন

অস্ট্রেলিয়ার স্কুলগুলোতে শিশুদের রাগান্বিত আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ যে ঘটনায় বা যার উপর শিশুরা রাগান্বিত হয় তার সাথে পুনরায় যোগাযোগ এবং সম্পর্ক স্থাপনের জন্য তাগিদ দেওয়া হয়। শিক্ষক এবং অভিভাবকদের উপস্থিতিতে শিশুরা দ্বিতীয়বার একই ব্যক্তি বা ঘটনার সম্মুখীন হলে নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং সংশোধন হওয়ার সুযোগ পায়।

Source: Telegraph

গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীই অন্যের সাথে রূঢ় আচরণের ব্যাপারে সচেতন থাকে না এবং অন্যের প্রতি রাগান্বিত আচরণ কি প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে চিন্তা করে না। যখনই তাকে দ্বিতীয়বার সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয় তখনই সে তার ভুল বুঝতে পারে এবং লজ্জিত হয়।

তবে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের এই প্রক্রিয়া সব শিশুর জন্য কাজে আসে না। সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে শিশু সচেতনভাবে খারাপ আচরণ করছে। তার জন্য উপযুক্ত কাউন্সেলিং এবং সংশোধনী প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়।

পারিবারিক চর্চা

শিশুর এই রাগী প্রবণতা দূর করার জন্য সুস্থ পারিবারিক চর্চার কোনো বিকল্প নেই। সন্তান যদি রাগী আচরণ করে এবং ভাই বোনের সাথে ঝগড়া বাধায় তবে পারিবারিকভাবে তাদের আচরণ সংশোধনের জন্য নির্দেশনা দিতে হবে। সাথে সাথে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

Source: Unicaf

আপনার পরিবারে যদি বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ এবং বিতর্ক লেগে থাকে তবে শত চেষ্টা করেও সন্তানকে এই প্রবণতার বাইরে রাখা যাবে না। তাই সন্তানের রাগী এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ দূর করতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করুন।

শিশুদের রাগান্বিত হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দূর করতে পিতামাতা, অভিভাবক, শিক্ষক শিক্ষিকাসহ শিশুকে ঘিরে থাকা সবাইকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শিক্ষা দিতে হবে। তবেই সন্তান ক্রমশ সুস্থ, স্বাভাবিক ও সুন্দর হয়ে উঠবে।

Feature Image: Yahoo

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

কিশোরদের ঘরের বাইরে থাকার প্রবণতা যেভাবে মোকাবেলা করবেন

শিশুর অ্যাংজাইটি ডিজওর্ডার কী? (পর্ব- ২)